১১১। সূরা লাহাব (লেলিহান আগুন)

সূরার সারসংক্ষেপঃ ১ম আয়াতের হাত সকল দৈহিক কর্মকান্ডের প্রকাশক। হাত ধ্বংস হওয়া মানে সকল কর্মকান্ড ধ্বংস হওয়া। এর সাথে ২য় আয়াতের ধন-সম্পদ ও উপার্জন কাজে না লাগার দ্বারা তার পুরো চেষ্টা ও ব্যক্তিত্বের ব্যর্থতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। ৩য় আয়াতে আগুন বোঝাতে আল্লাহ ইচ্ছা করেই তার নাম-‘লাহাব’ (টকটকে লাল চেহারার কারনে এমন নাম) শব্দটি ব্যবহার করেছেন তার মনের জ্বালা বাড়িয়ে দিতে।      

৪র্থ আয়াতে এই দুনিয়াতে তার সবচাইতে বড় সহযোগী তার স্ত্রীর ধ্বংসের কথাও বর্নিত হয়েছে। তার স্ত্রী মুহাম্মাদ (স) এর পথে কাঁটা দিতো, অন্যের মাঝে হিংসার আগুন ছড়িয়ে বেড়াতো যা তাঁকে জ্বালানীকাঠ বহনকারিনী বলা হয়। আখিরাতেও সে তার সহযোগী হবে এবং তার আগুনে কাঠ দিয়ে তা বেশি প্রজ্বলিত করবে। যা তাদের চুড়ান্ত ব্যর্থতার মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। ৫ম আয়াতে বলা হয়েছে যে, এছাড়া তার গলার হার বিক্রি করে ইসলামের শত্রুতা করার ইচ্ছার কারনে জাহান্নামে তার গলায় রশি পেচানো থাকবে।     

বিস্তারিত ও বিশেষ কিছু বিষয়ঃ আবু লাহাব রাসূল (স) এর আপন চাচা হলেও সে ছিলো ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে হিংসাত্মক, আক্রমনাত্মক, ধূর্ত শত্রু। তখনকার সময়ে ধনী, বিখ্যাত ও কাবার কোষাধ্যক্ষ সম্পাদক ছিল সে। সে তার দেহ, মেধা, কর্ম, অর্থ-সম্পদ দিয়ে ইসলামের বিরোধিতা করতো। লাহাব মানে লাল শিখা, যা উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকে। তাঁর গায়ের রঙ ছিল লালচে সুন্দর। এজন্য তাকে আবু লাহাব ঢাকা হতো। এই নাম ধরেই আল্লাহ তাকে উপহাস করেছেন পরের দিকের আয়াতে     এই লোক বিভিন্ন সময়ে নবীকে কষ্ট দিয়েছে। সে বলেছিল ‘তাবান লি হাজা আদ দ্বীন’ অর্থাৎ এই দ্বীন ধ্বংস হোক। আবার নবী (স) কেও বলেছিল ‘তাবান লাক’ তুমি ধ্বংস হও। এর জবাব দিতেই যেন, আল্লাহ এই ভাবে তার নামেই একটা সূরা অবতীর্ন করে তার ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, শত্রুতার জবাব দিয়েছেন। এখানে আল্লাহ কোন স্বজনপ্রীতি দেখান নি। রাসূলের চাচা বলে তাকে ছেড়ে দেওয়া বা মাফ করে দেয়ার কাজটি আল্লাহ করেননি। সুতরাং দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে কোন আপোষ বা  স্বজনপ্রীতি চলবে না।      

সূরার ১ম আয়াতটি মূলত অতীতকালের গঠনে বর্নিত হলেও এটা ছিলো একটি অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যতের ঘটনা। আবু লাহাব এর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সে অবমাননাকরভাবে (গায়ে পচন ধরে) মারা যায়। 

 সে জীবিত থাকা অবস্থায়ই সূরাটি নাযিল হয় কিন্তু সে ঈমান তো আনেই নাই বরং এ নিয়ে ঠাট্টা করতো। সে ইসলাম গ্রহন করলে আল কুরআনের এই ভবিষ্যৎ বানী ভুল প্রমানিত হতো। এটা আল কুর আনের একটি মোজেজা যে আল কুরআনের সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ বানীগুলো কখনও ভুল প্রমানিত হয়নি, হবেওনা। 

২ হাত এর কথাই এসেছে এখানে। হাত দিয়েই মানুষ বেশিরভাগ কাজ করে, অর্জন করে।  ডান হাত দিয়ে মানুষ সাধারনত আক্রমন করে এবং বাম হাত দিয়ে আত্মরক্ষা করে। তার ২ হাতই ধ্বংস- এর অর্থ দাঁড়ায় যে, ইসলামের প্রতি তার আক্রমনও কোন কাজে আসবে না এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তার নিজের প্রতিরক্ষাও সে করতে পারবে না।      

২য় আয়াতে বলা হচ্ছে যে সে নিজে ধ্বংস সম্মুখিন হয়েছে এবং তা থেকে তাকে রক্ষা করার কোন ব্যবস্থাও ছিল না। সাধারনত মানুষ তার ধন সম্পত্তি, সন্তান এর সাহায্য পায় কিন্তু এক্ষেত্রে সে কোনটাই লাভ করেনি। এখানে না বুঝাতে আরবী ‘মা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। না বোঝাতে আরবীতে কয়েকটি শব্দ ব্যবহৃত হয় যেমন লা, লাম, লান, মা এর মধ্যে মা শব্দটি সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী না বোধক ভাব প্রকাশ করে। অর্থাৎ অতি অবশ্যই তার ধন সম্পত্তি, সন্তান কোন উপকারে একদমই আসেনি।      

আবু লাহাবের স্ত্রীও ছিলো তার পারফেক্ট জুটি। উচ্চ বংশের সুন্দরী মহিলা ছিল সে। তার নাম ছিল উম্মে জামিল বা সুন্দরীদের মা অর্থাৎ অত্যন্ত সুন্দরী। তাদের ২ জনের বংশ মর্যাদা, চেহারা, আভিজাত্য সবই ছিলো খুবই উচ্চ মানের। এক কথায় তারা ছিলো সেলিব্রেটি পরিবার। দুজনেই ইসলামের বিরোধিতার ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন ছিল। ৩য় আয়াতে আবু লাহাবের স্ত্রীকে ‘ইমরআ’ হিসাবে অবিহিত করা হয়েছে। ‘ঝাওজ’ শব্দটি দিয়েও স্ত্রী বুঝায়। ‘ইমরআ’ ও ‘ঝাওজ’ দুটি শব্দের অর্থ স্ত্রী কিন্তু সূক্ষ পার্থক্য আছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সফল বৈবাহিক জুটি ও সন্তান হলে কেবলমাত্র ‘ঝাওজ’ ব্যবহার করা যায়। অন্যথায় ইমরআ হিসাবে গণ্য হয়। 

নবী নূহ (আঃ), লুত (আ) ও ফেরাউন এর স্ত্রীকে আল কুরআনে ‘ইমরআ’ বলা হয়েছে। যেহেতু আবু লাহাব ও তার স্ত্রী দুজনেই খারাপ ছিলো তাই এটা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সফল বৈবাহিক জুটি ছিলো না। তাই আবু লাহাবের স্ত্রী  ‘ঝাওজ’ ছিলো না বরং ‘ইমরআ’ ছিলো।     

তবে হযরত যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীর ক্ষেত্রে ২ টিই ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯ তম সূরা মারইয়াম এ যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীকে ‘ইমরআ’ বলা হয়। কারন তখন তিনি ছিলেন বন্ধ্যা (সন্তানহীন)।    

এরপর ২১ তম সূরা আল আম্বিয়ার ৯০ নং আয়াতে বর্নিত আছে যে, তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়। তখন যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীকে ‘ঝাওজ’ বলা হয়। কারন তখন তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সাফল বৈবাহিক জুটি ও সন্তান  এই দুটি বৈশিষ্ট্যেরই অধিকারী হন। কি অসাধারন, পারফেক্ট আল্লাহর শব্দচয়ন!!!     

সূরা আবাসার ৩৬ নং আয়াতে বোঝানো হয়েছেঃ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বৈবাহিক জুটি সফল হোক বা না হোক, সন্তান থাকুক বা না থাকুক পরকালে কিয়ামতের সময় তারা একে অপর থেকে দূরে সরে যাবে। স্বামী-স্ত্রীর এই বিশেষ সম্পর্ককে বলা হচ্ছে সহিবাহ (সঙ্গী)। এই সময়ে মানুষ অন্য সকল সম্পর্কের মানুষকে ভুলে শুধুমাত্র নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। 

অর্থাৎ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে কোন বিষয় উপস্থাপন ও পর্যালোচনার এই সুন্দর পদ্ধতি কুরআন আমাদের শেখায়।  

এর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অবশ্যই 'ঝাওজ'। এজন্য আল্লাহ আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন সূরা ২৫ নং আল ফুরকন এর ৭৪ নং আয়াতে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন 'ঝাওজ' (জীবনসঙ্গী) ও সন্তানাদি দান কর যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও। 

এই সূরায় আল্লাহ আবু লাহাবের সমস্ত চেষ্টা সাধনা ও উপায় উপকরন (হাত, কর্ম, ধন-সম্পদ, আয়-উপার্জন) সহ তার ধ্বংসের কথা বলেছেন; এমনকি তার স্ত্রীর কথাও! যে ছিলো ইসলামের বিরোধিতায় তার সহযোগী। তারা দুজনেই যেখানে প্রবেশ করবে তা হলো ‘লাহাব’ অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন। এখানে আল্লাহ তার নাম দিয়েই তাকে অপমানিত করে সেই নামের মধ্যেই সামিল করেছেন।       

তার স্ত্রীর তার সব কিছু দিয়ে মুহাম্মাদ (স) ও ইসলামের বিরোধিতা করতো, পথে কাটা বিছিয়ে রাখতো। সে প্রয়োজনে তার গলার হার বিক্রি করে হলেও বিরোধিতা করবে এমন ঘোষনা দিয়েছিল। তারা যে শুধু এই দুনিয়ায় পরাজিত হয়েছে তা নয় বরং আখিরাতেও অনন্তকালের জন্য একে অপরের সহায়তা করতে করতে ট্যাগ টিম গঠন করে ভয়াবহ চিরস্থায়ী পরাজয়ের স্বাদ পাবে। ৪র্থ আয়াতে বলা হয়েছে যে যে জাহান্নামেও জ্বালানী কাঠ বহন করতে থাকবে, যেমনটি দুনিয়ায় বিভিন্ন কথা, গুজব, ঝগড়া লাগিয়ে মানুষের মধ্যে, সম্পর্কের মধ্যে হিংসা ও খারাপের আগুন লাগাতো। সে আখিরাতে বার বার, বিরতিহীনভাবে কাঠ বহন করতে থাকবে নিজের ও তার জ্বালানী কাঠ এটা বোঝা যায় কারন আল্লাহ এখানে ‘হামিলাহ’ ব্যবহার না করে ‘হাম্মালাহ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন যা দ্বারা বার বার বোঝায় ।       

৫ম আয়াতে আবু লাহাবের স্ত্রীর গলায় পাকানো রশি থাকবে এটা বলা হয়েছে। এটি তার গর্ব, অহংকারের প্রতি আরেকটি আঘাত।  গলার হার বিক্রি করে হলেও বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তার সেই হার আখিরাতে আযাবের অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।  সুতরাং ইসলামের শত্রুতার ক্ষেত্রে যে শুধু পুরুষরাই আছে এমন নয়, নারীরাও ভয়াবহ শত্রু হতে পারে। নারী হয়েও শাস্তি থেকে পার পাওয়া যাবে না, যেমনটি আত্মীয় হয়ে পার পায়নি আবু লাহাব।      

আল্লাহ এই সূরায় তাদের উভয় লিঙ্গের (পুরুষ, নারী) উভয় জগতে অবমাননাকর পরাজয়ের ভবিষ্যত বানীর মাধ্যমে ইসলামের চুড়ান্ত বিজয়ের একটা ছোট্ট নমুনা দেখিয়ে দিয়েছেন।  

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ২ টি সূরাঃ কাফিরুন ও নাসর । ১০৯ নং সূরা আল কাফিরুন (goo.gl/zvRLkM) এ ২ টা দ্বীন এর কথা এসেছে এবং তাদের পার্থক্যের কথা বর্নিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সত্যের চুড়ান্ত বিজয় হয় ও মিথ্যার চুড়ান্ত পরাজয় হয়। ২ টা দ্বীন এর মধ্যে ১১০ নং সূরা আন নাসরে (goo.gl/GSeZRZ) সত্য দ্বীনের বিজয়ের নমুনার কথা ও এই সূরায় (১১১ নং সূরা লাহাব এ) মিথ্যা দ্বীনের পরাজয়ের নমুনার কথা এসেছে। কি অসাধারন সিকুয়েন্স!    

সূরা কাফিরুন এ আল্লাহ নবীকে দিয়ে কাফিরদের সম্বোধন করিয়েছেন। কিন্তু সূরা লাহাবে এসে আল্লাহ নিজেই আবু লাহাব সম্পর্কে বলেছেন। ঠিক যেন এমন যে, তিনি তার নবীর পক্ষ নিয়ে তাকে কষ্ট দেয়ার জবাব দিয়েছেন!      

সূরা আন নাসরে বলা হয়েছে মানুষ ভাল হলে তাসবীহ, প্রশংসা, তাওবা, ইসতিগফার কাজে আসবে, উপকৃত করবে আর সূরা লাহাব এ বলা হয়েছে মানুষ খারাপ হলে কোন কোন জিনিস কাজে আসবে না তাহলো অর্থ বিত্ত, সন্তান।      

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ     বিজয় লাভ ও শত্রুর পরাজয়ের পর পরই আসলে মুল লক্ষ্যের দিকে ফোকাস করতে হয়। এমনটিই করেছেন আল্লাহ । তাওহীদের মুল বক্তব্য তুলে ধরছেন পরের (১১২ নং) সূরা আল ইখলাসে। এই তাওহীদের কারনেই মুল দ্বন্দ্ব হয়েছিলো ২টি পক্ষের মধ্যে এবং তা আজীবন চলতে থাকবে।      

সূরা লাহাবের শেষ আয়াতের শেষ অক্ষর ‘মাসাদ’ এর সাথে পরের সূরা (১১২ নং) সূরা আল ইখলাসের ১ম আয়াতের শেষ অক্ষরের মিল রয়েছে। এ যেন এক কাব্যিক কন্টিনিউএশন।

সূরা লাহাবে বর্নিত শত্রুর পরাজয়ের পর পরই আসলে মুল লক্ষ্যের দিকে ফোকাস করতে হয় এবং তাওহীদের শক্ত ভিত্তি দাড় করাতে হয় তার নমুনা আল্লাহ সূরা ইখলাসে দিয়ে দিয়েছেন। এভাবে ভাবগত, ছন্দ ও কাব্যিক মিলের মাধ্যমে দুটি সূরার সম্পর্ক আরো জোরালো হয়েছে।    


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)